লেখক: ইফতেখার মাহমুদ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখন অর্থনীতিতে। ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হয়ে উঠেছে চমকেভরা জাদুর বাক্স। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ এখন বাণিজ্যনির্ভর দেশে পরিণত। তবে যাত্রাপথটা সহজ ছিল না। বড় বড় ঝুঁকি নিয়ে অভিনব পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আমাদের সাহসী উদ্যোক্তারা। এই সাফল্যের পেছনে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ যেমন ছিলেন, আছেন নীতিনির্ধারকেরাও। মূলত অর্থনীতির এসব অগ্রনায়ক, পথ রচয়িতা ও স্বপ্নদ্রষ্টারাই ৫০ বছরে বিশ্বে বাংলাদেশকে বসিয়েছেন মর্যাদার আসনে।
আমরা বেছে নিয়েছি সেই নায়কদের মধ্যে ৫০ জনকে। আমাদের কাছে তারাই অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার
সেই ১৯৯৭ সালের কথা। তরুণ ডন আবদুস সালাম বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রড) ধান প্রজনন বিভাগের বিজ্ঞানী। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধানের জাত বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ উদ্ভাবনের তিন বছর হয়েছে। উদ্ভাবকদের সেই দলে তিনিও ছিলেন।
কৃষকেরা ধানটি পছন্দ করলেন কি না, সেটি দেখতে তিনি একদল বিজ্ঞানীকে নিয়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় গেলেন। গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে গেলে খানিকটা জিরিয়ে নিতে একটি বাড়ির উঠানের ছায়ায় দাঁড়ালেন। বাড়ির ভেতর থেকে একজন মাঝবয়সী কৃষক এগিয়ে এসে পরিচয় জানতে চাইলেন। আবদুস সালাম জানালেন, তাঁদের উদ্ভাবিত নতুন দুটি জাত কেমন ফলন দিচ্ছে, তা দেখতেই এসেছেন।
কথাটি শোনামাত্রই ওই কৃষক আবদুস সালামকে জড়িয়ে ধরেন। নতুন চকচকে টিনের চাল দেখিয়ে বললেন, ‘আপনাদের জাত চাষ করে আমার ভালো ধান হইছে। সেই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে আমি কুঁড়েঘর ভেঙে টিনের বাড়ি করেছি।’
বিজ্ঞানী হিসেবে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধানের জাত উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা আবদুস সালাম নিজের জীবনের স্মরণীয় এই ঘটনার কথা জানালেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ওই দুই জাতের ধান উদ্ভাবকদের দলে থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা নিয়ে অবশ্য থেমে থাকেননি আবদুস সালাম। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশের উত্তরাঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক এই দুই মাস ছিল অভাব বা মঙ্গার সময়। ওই সময়ে কোনো ফসল উঠত না। সালামের নেতৃত্বে ব্রির বিজ্ঞানীরা মাত্র ১১৮ দিনে পাকে এমন জাতের ধান বিআর-৩৩ উদ্ভাবন করলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে ওই ধান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেটির কল্যাণে মঙ্গা এখন প্রায় জাদুঘরে ঠাঁই নিয়েছে।
বিআর-৩৩-এর একে একে লবণ, বন্যা, খরাসহিষ্ণুসহ মোট ২১টি ধানের জাত উদ্ভাবনের নেতৃত্বে ছিলেন এই আবদুস সালাম। দেশে চালের উৎপাদন এক কোটি টন থেকে ৫০ বছরে সোয়া চার কোটি টনে পরিণত হওয়ার পেছনে এই জাতগুলোর অবদান অনেক।
নিজের কর্মজীবন আর অবদান নিয়ে বেশি মাতামাতি করা অপছন্দ আবদুস সালামের। ফেসবুক থেকে শুরু করে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই উৎসাহ। স্মার্টফোন কখনো হাতে নেন না। পুরোনো আমলের ফিচার ফোনটি দেখিয়ে স্মিত হেসে বললেন, সাক্ষাৎকার দিয়ে কী হবে। কাজ করাটাই আসল কথা।
২০০৬ সালে বিশ্বের সেরা ধান প্রজননবিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের (ইরি) থেকে সেনাধিরা আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা পুরস্কার পেয়েছিলেন আবদুস সালাম। ২০১০ সালে ব্রি থেকে অবসর নিয়েছেন। তারপর বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকে ধানের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে যুক্ত আছেন এই বিজ্ঞানী।
আবদুস সালামের পরিকল্পনা ছিল, অবসরের পর গ্রামের বাড়িতে নিভৃতে সময় কাটাবেন। তবে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের (ইরি) সাবেক পরিচালক ড. মাহবুব হোসেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানীর সঙ্গে প্রশিক্ষণে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় গিয়েছিলেন আবদুস সালাম। ইরির শীর্ষ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেনের বাসায় সবার দাওয়াত ছিল। সেখানেই মাহবুব হোসেনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। পরে আর তেমন কথা না হলেও মাহবুব হোসেন যে তাঁর গবেষণা ও উদ্ভাবনগুলো খেয়াল রেখেছিলেন, তা পরে টের পেলেন।
২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ছিল ব্রিতে আবদুস সালামের কর্মজীবনের শেষ দিন। তার ঠিক দুই দিন আগে নিজের কার্যালয়ে কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর কক্ষে উপস্থিত হলেন মাহবুব হোসেন। বললেন, ‘আপনি তো অবসরে যাচ্ছেন। আমিও ইরি থেকে অবসর নিয়ে বাংলাদেশে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছি। চলেন দুজনে মিলে আরও কিছু করা যায় কি না দেখি। আপনি যেসব জাত উদ্ভাবনের পরিকল্পনা করেছিলেন, তা আমাদের সঙ্গে করেন। আসছে মাসে ব্র্যাকে যোগ দিন।’
মাহবুব হোসেনের আমন্ত্রণ ফেলতে পারলেন না আবদুস সালাম। ব্র্যাকে যোগ দিয়ে সুগন্ধি চালকে মধ্যবিত্তের ক্রয়সীমার মধ্য আনতে নতুন জাত উদ্ভাবনে মনোযোগ দিলেন। সারা দেশ থেকে ১০১ পোলাও চালের জাত সংগ্রহ করলেন। এগুলো মূলত দেশীয় প্রজাতি, একরপ্রতি ফলন কম। এই জাতগুলোকে উচ্চফলনশীল জাতে রূপান্তরের জন্য কাজ শুরু হলো। তবে ২০১৬ সালে মাহবুব হোসেন মারা গেলে সেই কাজে ছেদ পড়ে।
আবদুস সালাম ব্র্যাক ছেড়ে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বৈদেশিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির সহায়তায় ইরি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান এসিআইয়ের ধানের নতুন জাত উদ্ভাবনের একটি প্রকল্পে। সেটির অধীনে নতুন প্রজন্মের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের জন্য কাজ চলছে। তাঁর নেতৃত্বে ইতিমধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে একটি এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আরেকটি জাত উদ্ভাবন হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য অনুমোদন পেয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চফলনশীল জাতের সুগন্ধি চাল ও বাসমতি চালের মতো লম্বাটে সুগন্ধি চাল উদ্ভাবনের কাজও শেষের দিকে। জানালেন, আগামী দু-এক বছরের মধ্যে তা অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে।
উফশী জাতে মনোযোগ
দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় নিজের কোনো ভূমিকা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুস সালাম তাঁর পূর্বসূরিদের অবদানের কথাই বেশি বললেন। একে একে বলতে থাকলেন স্বাধীনতার পর দেশের খাদ্যসংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তাঁর প্রতিষ্ঠান ব্রি কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জানালেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত প্রথম ধানের জাত ছিল ‘বিপ্লব’। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতাযুদ্ধের সফলতার স্মারক হিসেবে জাতটির এই নামকরণ করা হয়। কৃষকেরা এই জাত পেয়ে আশান্বিত হয়েছিলেন। তবে পোকার আক্রমণ ও বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় ‘বিপ্লব’ জনপ্রিয় হয়নি।
সদ্য স্বাধীন দেশের জনসংখ্যা প্রায় আট কোটি। এখনকার মতো তখনো মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ধানের দেশি জাতের ফলন কম। সত্তরের দশক পেরিয়ে আশির দশকের শুরুতে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে প্রথম জনপ্রিয় হয় ‘মুক্তা’ নামের একটি জাত; যাকে বিজ্ঞানীরা বিআর-১১ নাম দিয়েছিলেন। এরপর বিজ্ঞানীরা একের পর এক জাত উদ্ভাবন করে গেলেও কোনোটিই জনপ্রিয় হচ্ছিল না। বৃষ্টিনির্ভর এসব জাত দিয়ে সব মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা যাচ্ছিল না। চাল আমদানি করতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ চলে যেত।
এ রকম এক পরিস্থিতিতে ব্রির বিজ্ঞানীরা ১৯৯৪ সালে বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ নামের দুটি জাত উদ্ভাবন করে কৃষকের হাতে পৌঁছে দিলেন। তারপর মূলত দেশের কৃষির দৃশ্যপটই বদলে গেল। বৃষ্টিহীন বোরো মৌসুমের সেচনির্ভর এই জাত দুই বছরের মধ্যেই সারা দেশের কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে যায়। তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। এই জাত দুটির ওপর ভর করেই ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো আমদানি ছাড়াই দেশে উৎপাদিত চাল দিয়ে খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।
এক থেকে আরেক ধাপে
দেশে বর্তমানে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চাল আর আমদানি করতে হয় না; বরং সীমিত পরিসরে চাল রপ্তানিও করে বাংলাদেশ। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুস সালাম বলেন, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ জাতের নতুন প্রজন্ম উদ্ভাবন করতে হবে। জাতগুলো ব্লাস্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নতুন নতুন পোকার আক্রমণ শুরু হয়েছে।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় রোগমুক্ত এবং আরও বেশি ফলন দেবে এমন জাত উদ্ভাবনের নেশায় মেতে আছেন বিজ্ঞানী আবদুস সালাম। তাঁর হাত ধরেই ১৯৭৩ সালে বিপ্লব ধান দিয়ে উফশী জাতের ধান উদ্ভাবনের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল। চলতি বছর এসে শততম জাত হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ব্রির উদ্ভাবিত বঙ্গবন্ধু। এর মধ্যে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এই পুরো সফলতার সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন আবদুস সালাম।
সূত্রঃ প্রথম আলো।
তারিখঃ নভেম্বর ২২, ২০২১
রেটিং করুনঃ ,